কাপুরুষাঙ্গ- জয়ন্ত
অন্ধকারে ঘড়ি দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু অনুমান করতে পারছি যে রাত খুব একটা কম হয় নি। ঘুমের মাঝে রাতটা যে কখন গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যায়,তা বুঝতে পারা বড্ড মুশকিল। যত স্থিরতা আঁকড়ে ধরে জাগরিত শরীরটাকে।কিন্তু ভয়ার্ত শিহরণও হঠাৎ হঠাৎই উদয় হয় রক্তের শিরদাঁড়ার ঠিক মাঝ বরাবর ।আর তখনি চোখের সামনে অপ্রীতিকর ঘটনার প্রবাহচিত্র ভেসে ওঠে, তার সত্যতার রহস্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উন্মোচন করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না।
এগুলো ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু ঘুম আসল না । কোথা থেকে যেন একটা দড়ি টানা দাগের যন্ত্রনা অনুভব করছিলাম। বালিশের পাশে শরৎ এর শুভদা পড়ে আছে । আজ রাতে সেও নিস্প্রভ। অন্ধকার তাকেও আষটে-পৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে।
বুঝতে পারলাম পানির তৃষ্ণা পেয়েছে । কিন্তু জগটা ছিল পানিশূন্য। গোটা জগতটাই যেন আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে আজ, তাদের এই অনমন্যতা যেন এক একটি প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে আমাকে। এই অন্ধকারে পায়ে হেঁটে সিঁড়ি বেয়ে নামতে হবে ভেবে আমার মাঝে যেটুকু ভয় হবার দরকার ছিল তার বিন্দুমাত্রও এসেছিলো বলে মনে পড়ে না। তবে আলস্যকে পাশ কাটিয়ে উঠে পড়তে সামান্য দেরি হল মাত্র।
বেডরুম পেরিয়ে বারান্দা, বারান্দার সাথে সিঁড়ি করা। দোতলা বাড়ির উপরতলায় আমি থাকি সস্ত্রীক, আর নীচতলায় আমার মা বাবা থাকে। সপ্তাহখানেক হল আমার স্ত্রী তার বাপের বাড়ী।সেহেতু দোতলায় এই দিন কয়েক আমাকে একাই থাকতে হয়।
অসম্ভব কিছু সুন্দর আঁধার তরঙ্গাকারে প্রবেশ করছে রেলিং ঘেঁষে। সেই অন্ধকার প্রাচীর টপকে জোনাকি সমান আলো আসছে দূরের রাস্তাটার ঐ ল্যাম্পপোস্টটা থেকে। বড্ড বেমানান লাগছে তাকে।
-একি! কে ওখানে?
কোন উত্তর না পেয়ে একি প্রশ্ন আবার ছুড়লাম।এবার একটি কণ্ঠ ভেসে আসলো।
-ভুলেই গেলে আমাকে?
নারীকণ্ঠ শুনেই হকচকিয়ে গেলাম।কয়েক পা পিছিয়ে গেলাম আমি। আমি নিসচুপ,আমার নিরবতাকে সারা অঙ্গে মাখছে প্রকৃতি। ঝি ঝি পোকাগুলোও স্তব্ধ, অথবা আমার কানের গহ্বরে তা প্রতিফলিত করবার জন্য সঠিক উদ্দীপনা আমার মস্তিষ্ক দিতে প্রস্তুত নয়। নীরবতা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে লাগলো।ওপাশে যে দাঁড়িয়ে আছে তার অবয়ব স্পষ্ট নয়। আমি বড় দেরি করলাম না । চিৎকার করে উঠলাম । কিন্তু চিৎকারের শব্দ বোধহয় বায়ুর ভেতর দিয়ে প্রবেশ করতে পারল না, বরং আমার কানের অভ্যন্তর দেশেই বারকয়েক প্রতিধ্বনিত হয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে নিজেই স্বপ্রচেষ্টায় থেমে গেল।
-তুমি তো পুরুষ, চিৎকার কেন? ওটা তো কেবল মানায় আমাদেরই কণ্ঠে।আর তখন তোমরা আমাদের মুখের ভেতর গুজে দেবে শুঁকনো কাপড়। আর কিছু নির্লিপ্ত দর্শকও থাকবে তোমাদের সাথে। আমরা চিৎকার করব,আর সেই চিৎকার তোমাদের প্রত্যেক উপশিরায় টঙ্কার সৃষ্টি করবে। এটাই তো চাও তোমরা, মহান পুরুষ জাতি।
সে কথার অর্থ বোঝার ক্ষমতা সেই মুহূর্তে আমার ছিল না । আমার মস্তিষ্ক ক্রমশ বিকৃত হয়ে আসছিল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো নরকের দূয়ারে দাঁড়িয়ে আমি, একাকিত্তের গহব্বরে বন্দী একটি নগণ্য কীট মনে হল নিজেকে।
-কে তুমি?
-তোমার পাপের ছায়া।তোমার অন্ধকার রাতের একমাত্র সঙ্গী।
-কি চাও তুমি?
-আমিতো কিছুই চাই না। তুমিই তো চাও আমায়, আমার শরীরকে।
-সে কি কথা!কি ক্ষতি করেছি আমি তোমার?
-দেখতে চাচ্ছ তবে?
আমি প্রত্যুত্তর দিলাম না, না জানি আরও কিছু ভয়ঙ্কর মুহূর্ত কাটাতে হয়। আমি ততক্ষণে হাটুমুড়ে বসে পড়েছি। এবার দেখলাম অন্ধকার চিঁড়ে আবছা আলো সহকারে বেরিয়ে আসা একটি নারীর ছায়ামূর্তি। সে ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগলো। বাঁধা দেবার কোন প্রচেষ্টাই আমি করলাম না।
উন্মুক্ত স্তন, তা হতে অনবরত রক্ত ঝরছে। শাড়ির ছেঁড়া আঁচল ধূলোদের সাথে খেলায় মত্ত হয়ে আছে । অমাবস্যার মেঘের মতো চুলগুলো আমাকে কটাক্ষ করছে যেন। আমি আর সামলাতে পারলাম না নিজেকে । বুঝতে পারলাম আমি কাঁদছি।
-একি! কাঁদছ কেন? যে কান্না দেখে তোমরা পুরুষেরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ো, তাদের চোখে কি জল মানায়! চোখের জল তোমার চোখে অশোভিত। রক্তই তোমার একমাত্র প্রাপ্য। তুমিই তো আমার এই শরীরের ক্ষত চিনহের নির্মাতা। এই ক্ষত থেকে যত বিন্দু রক্ত ঝরবে সবই তুমি পান কর।এই শরীর আজ থেকে তোমার, ভোগ করতে পিছপা হয়ো না যেন।
নারীমূর্তিটি আরও নিকটবর্তী হল । আমি চিনতে পারলাম তাকে । হ্যাঁ, এই তো সেই মেয়েটি, যাকে ধর্ষণ করেছিলাম আমি, আমরা , আমরা এই পুরুষেরা। কি নিরবিকারভাবে বললাম কথাটা! এতটা নির্বিকার হয়ত ছিলাম না সেদিন। তবে কোন এক পশুত্ব আঁকড়ে ধরেছিল গোটা শরীরটাকে । আর পাঁচজন যখন মেয়েটার শরীরে ঠোকর মারছিল,আমি নিজেকে তখন সামলাতে পারিনি , প্রতিবাদ তো দূরের কথা। পাষণ্ডতা আমার শরীরটাকে হঠাৎ করেই বেঁধে ফেলেছিল। হয়ত কাজটা হয়েছিল আমার অবচেতন মনে।কিন্তু একথা নিশ্চিত বলতে পারি মেয়েটা অবচেতন ছিল না, বরং বাঁধা দেবার তীব্র প্রখরতায় নিজেকে ক্ষত বিক্ষত করেছিলো । চলন্ত ট্রেনের ভেতরে যা ঘটেছিল তার বর্ণনা দিলে মানুষ এই কাহিনীকে প্রতিবাদের ভাষা না ভেবে যে অশ্লীল ভাষা ভাববে, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত জানি।
তবে আমাদের অর্থাৎ ধর্ষকদের চিন্তার তেমন কোন কারণ অবশ্য ঘটে নি। কখনো নিজেকে পাপী মনে হয় নি। কারণ সেই যুবক বয়সে আমাকে সমাজ বুঝিয়ে দিয়েছিল যে ধর্ষণের শুধুমাত্র একটাই কারণ, সেটা হল নারীর নগ্নতা,পুরুষের চরিত্রহীনতা নয়।পুরুষের তো যৌন চাহিদা থাকবেই।
একারণেই নিজেকে মহৎ লাগতো। হাজার হোক একটা অশ্লীল মেয়েকে তো তাড়ালাম। তাড়ালাম বললাম কারণ মেয়েটি আমাদের অপেক্ষা মৃত্যুকে কম ভয় পেয়েছিলো। এক পর্যায়ে সে ট্রেন থেকে ঝাঁপ মেরেছিলো। তবে সেটা পাঁচ বছর আগেকার ঘটনা। আর মেয়েটা যে মারা গিয়েছিলো সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। তবে সে এখানে আসলো কি করে! মনের মাঝে এই প্রশ্নটা ঘূর্ণিপাক সৃষ্টি করেছে । তবে পাল্টা প্রশ্ন করবার মানসিক অবস্থা আমার তখন ছিল না। বরং কখন জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম আমি নিজেই জানি না।
যখন জ্ঞান হল ,তখন আমার চোখের সামনে অনেকগুলো মোটা রড । সরকারের জেলখানা যে নয় সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত । তবে এটা হয়ত বিধাতার শাস্তি । তিনি তো আর সমাজের মতো পুরুষের নির্লজ্জতা উপভোগ করতে পারেন না। বুঝতে পারলাম আমি পাগলাগারদে । জানতে পারলাম আমার চুল দাড়িতে নাকি পাক ধরেছে।কত গুলো বছর কেটে গেছে তা কারো কাছে জানতে চাইবার সাহস হল না । হয়ত ঘণ্টার কাঁটা এরই মধ্যে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। আর হয়ত পাপের সাক্ষীস্বরূপ স্থির রেললাইনের ধারে কোন একটি পাথরে চাপা পড়ে আছে এক টুকরা শাড়ির কাপড়,তাকে আজ কুড়নোর মতো কেউ নেই। কাপড়ের টুকরাটি আজো ঘৃণা করে পুরুষদেরকে,পুরুষাঙ্গদেরকে। শব্দটা পুরুষাঙ্গ হবে নাকি কাপুরুসাঙ্গ হবে সে বিষয়ে আমি সন্ধিহান।
-একি! কে ওখানে?
কোন উত্তর না পেয়ে একি প্রশ্ন আবার ছুড়লাম।এবার একটি কণ্ঠ ভেসে আসলো।
-ভুলেই গেলে আমাকে?
নারীকণ্ঠ শুনেই হকচকিয়ে গেলাম।কয়েক পা পিছিয়ে গেলাম আমি। আমি নিসচুপ,আমার নিরবতাকে সারা অঙ্গে মাখছে প্রকৃতি। ঝি ঝি পোকাগুলোও স্তব্ধ, অথবা আমার কানের গহ্বরে তা প্রতিফলিত করবার জন্য সঠিক উদ্দীপনা আমার মস্তিষ্ক দিতে প্রস্তুত নয়। নীরবতা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে লাগলো।ওপাশে যে দাঁড়িয়ে আছে তার অবয়ব স্পষ্ট নয়। আমি বড় দেরি করলাম না । চিৎকার করে উঠলাম । কিন্তু চিৎকারের শব্দ বোধহয় বায়ুর ভেতর দিয়ে প্রবেশ করতে পারল না, বরং আমার কানের অভ্যন্তর দেশেই বারকয়েক প্রতিধ্বনিত হয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে নিজেই স্বপ্রচেষ্টায় থেমে গেল।
-তুমি তো পুরুষ, চিৎকার কেন? ওটা তো কেবল মানায় আমাদেরই কণ্ঠে।আর তখন তোমরা আমাদের মুখের ভেতর গুজে দেবে শুঁকনো কাপড়। আর কিছু নির্লিপ্ত দর্শকও থাকবে তোমাদের সাথে। আমরা চিৎকার করব,আর সেই চিৎকার তোমাদের প্রত্যেক উপশিরায় টঙ্কার সৃষ্টি করবে। এটাই তো চাও তোমরা, মহান পুরুষ জাতি।
সে কথার অর্থ বোঝার ক্ষমতা সেই মুহূর্তে আমার ছিল না । আমার মস্তিষ্ক ক্রমশ বিকৃত হয়ে আসছিল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো নরকের দূয়ারে দাঁড়িয়ে আমি, একাকিত্তের গহব্বরে বন্দী একটি নগণ্য কীট মনে হল নিজেকে।
-কে তুমি?
-তোমার পাপের ছায়া।তোমার অন্ধকার রাতের একমাত্র সঙ্গী।
-কি চাও তুমি?
-আমিতো কিছুই চাই না। তুমিই তো চাও আমায়, আমার শরীরকে।
-সে কি কথা!কি ক্ষতি করেছি আমি তোমার?
-দেখতে চাচ্ছ তবে?
আমি প্রত্যুত্তর দিলাম না, না জানি আরও কিছু ভয়ঙ্কর মুহূর্ত কাটাতে হয়। আমি ততক্ষণে হাটুমুড়ে বসে পড়েছি। এবার দেখলাম অন্ধকার চিঁড়ে আবছা আলো সহকারে বেরিয়ে আসা একটি নারীর ছায়ামূর্তি। সে ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগলো। বাঁধা দেবার কোন প্রচেষ্টাই আমি করলাম না।
উন্মুক্ত স্তন, তা হতে অনবরত রক্ত ঝরছে। শাড়ির ছেঁড়া আঁচল ধূলোদের সাথে খেলায় মত্ত হয়ে আছে । অমাবস্যার মেঘের মতো চুলগুলো আমাকে কটাক্ষ করছে যেন। আমি আর সামলাতে পারলাম না নিজেকে । বুঝতে পারলাম আমি কাঁদছি।
-একি! কাঁদছ কেন? যে কান্না দেখে তোমরা পুরুষেরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ো, তাদের চোখে কি জল মানায়! চোখের জল তোমার চোখে অশোভিত। রক্তই তোমার একমাত্র প্রাপ্য। তুমিই তো আমার এই শরীরের ক্ষত চিনহের নির্মাতা। এই ক্ষত থেকে যত বিন্দু রক্ত ঝরবে সবই তুমি পান কর।এই শরীর আজ থেকে তোমার, ভোগ করতে পিছপা হয়ো না যেন।
নারীমূর্তিটি আরও নিকটবর্তী হল । আমি চিনতে পারলাম তাকে । হ্যাঁ, এই তো সেই মেয়েটি, যাকে ধর্ষণ করেছিলাম আমি, আমরা , আমরা এই পুরুষেরা। কি নিরবিকারভাবে বললাম কথাটা! এতটা নির্বিকার হয়ত ছিলাম না সেদিন। তবে কোন এক পশুত্ব আঁকড়ে ধরেছিল গোটা শরীরটাকে । আর পাঁচজন যখন মেয়েটার শরীরে ঠোকর মারছিল,আমি নিজেকে তখন সামলাতে পারিনি , প্রতিবাদ তো দূরের কথা। পাষণ্ডতা আমার শরীরটাকে হঠাৎ করেই বেঁধে ফেলেছিল। হয়ত কাজটা হয়েছিল আমার অবচেতন মনে।কিন্তু একথা নিশ্চিত বলতে পারি মেয়েটা অবচেতন ছিল না, বরং বাঁধা দেবার তীব্র প্রখরতায় নিজেকে ক্ষত বিক্ষত করেছিলো । চলন্ত ট্রেনের ভেতরে যা ঘটেছিল তার বর্ণনা দিলে মানুষ এই কাহিনীকে প্রতিবাদের ভাষা না ভেবে যে অশ্লীল ভাষা ভাববে, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত জানি।
তবে আমাদের অর্থাৎ ধর্ষকদের চিন্তার তেমন কোন কারণ অবশ্য ঘটে নি। কখনো নিজেকে পাপী মনে হয় নি। কারণ সেই যুবক বয়সে আমাকে সমাজ বুঝিয়ে দিয়েছিল যে ধর্ষণের শুধুমাত্র একটাই কারণ, সেটা হল নারীর নগ্নতা,পুরুষের চরিত্রহীনতা নয়।পুরুষের তো যৌন চাহিদা থাকবেই।
একারণেই নিজেকে মহৎ লাগতো। হাজার হোক একটা অশ্লীল মেয়েকে তো তাড়ালাম। তাড়ালাম বললাম কারণ মেয়েটি আমাদের অপেক্ষা মৃত্যুকে কম ভয় পেয়েছিলো। এক পর্যায়ে সে ট্রেন থেকে ঝাঁপ মেরেছিলো। তবে সেটা পাঁচ বছর আগেকার ঘটনা। আর মেয়েটা যে মারা গিয়েছিলো সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। তবে সে এখানে আসলো কি করে! মনের মাঝে এই প্রশ্নটা ঘূর্ণিপাক সৃষ্টি করেছে । তবে পাল্টা প্রশ্ন করবার মানসিক অবস্থা আমার তখন ছিল না। বরং কখন জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম আমি নিজেই জানি না।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন