চৌদ্দর চিঠি - জয়ন্ত

প্রিয় এগারো,.

তুই হয়তবা ভালো করেই জানিস ভুমিকা আমার একদমই পছন্দের নয়। তোকে হয়ত এই প্রথম এবং এই শেষবারের মত চিঠি লিখছি। তাই ভূমিকার মাধ্যমে কাগজ, কালি কিংবা সময় কোনোকিছুরই অপচয় করবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু এই দেখ, ভুমিকাহীনতার ভুমিকা দিতে দিতেই কতকটা সময় কেটে গেল। এবার তাহলে আসল কথায় আসা যাক ।আচ্ছা তুই কি এখনো ভাবিস যে আমি তোর উপর অনেকটা বিরক্ত? বিরক্তিকেই আমার বিরক্ত লাগে। তোর উপর সত্যি বলতে আমি বিরক্ত হই নি কখনো, বরং অবাক হয়েছি।তোর অদ্ভুতরকম কথাগুলোর বিস্ময়ের ভারে আমি হতচকিত হয়ে যেতাম।হঠাৎ তুই একদিন বললি আমায়, "আচ্ছা দিদি, মানুষ কি মরতে ভালবাসে?"আমি খানিকটা আবেগ নিয়ে মনে মনে তোর দার্শনিকতাসম্পন্ন প্রশ্নের প্রসংসা করে বললাম,"হ্যাঁ"।এরপর তুই যে প্রত্যুত্তর দিলি তা ছিল আমার কাছে সত্যিই অপ্রত্যাশিত। তুই বললি,                                                       "তাহলে আপনি কেন মরেন না?"

সেদিন অনেকটা কেঁদেছিলাম। কেন কেঁদেছিলাম তা জানি না।মেয়েদের চোখের জল নিয়ে তো কম উপন্যাস, গল্প, কবিতা বের হল না।তাতে মহাকবিগণ আর ঔপন্যসিকবৃন্দ মেয়েদের চোখের জলের পোস্টমরটাম করে তার শিরা, উপশিরা , ধমনী সবকিছু নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। অতঃপর হেরে যাবার পরও জয়ী হবার ভঙ্গিতে বিজ্ঞের মত বলে গেছেন মেয়েদের কান্না নাকি রহস্যময়। কোথা থেকে তোমরা পুরুষেরা খুঁজে পাও এতো রহস্য? আমি তো কখনো রহস্য পেলাম না আজ পর্যন্ত আমার কান্নায়। তবে পেলে জীবনে অন্তত একটাবারের জন্যে হলেও শার্লক হোমস হবার চেষ্টা করবো।

আচ্ছা তোর কি মনে আছে একদিন লাইব্রেরি থেকে পালিয়েছিলি আমার মাথায় পাথর মেরে?আমি তখন সবেমাত্র ক্লাস নাইনে উঠেছি।এই চৌদ্দ বছরের মেয়েটার মাথায় হঠাৎ করেই গ্রীক ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটি করবার এক তীব্র বাসনা জেঁকে বসলো। সময় পেলেই স্কুলের লাইব্রেরিতে গিয়ে নাড়াচাড়া করতাম বইগুলো। আর একটা সখ ছিল পেপার কাটিংএর। সেদিন লাইব্রেরির ঠিক একদম বাম কোণায় বসে ছিলাম আমি। ব্যাথা অনুভব করবার পর বুঝতে পারলাম কেউ ইচ্ছা করেই শক্ত কিছু একটা ছুড়েছে আমার কপাল লক্ষ্য করে। আর সময় ব্যায় না করেই বস্তুটির আগমন উৎস খোঁজার চেষ্টা করলাম। তাকিয়ে দেখলাম একটা ছেলে দৌড়ে পালাচ্ছে। পেছন থেকে দেখেই চিনলাম তোকে। যদিও সেই মুহূর্তে আমার চোখের সামনের সবকিছুই ঝাপসা হয়ে আসছিল, তবুও তোর মুখের ক্রূড় হাসিটা আমি ঠিকই লক্ষ্য করেছিলাম।

তোর সাথে আমার প্রথম কবে আলাপ হয় মনে আছে? আমাদের স্কুলের বার্ষিক বিতর্ক অনুষ্ঠানে। আলাপটা যে সেদিন তোর জন্য অত্যন্ত সুখদায়ক ছিল না তা আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি। ভাগ্যক্রমে তোর দলের সাথেই আমাদের বিতর্ক হল। সেদিন জানিস, তোর যুক্তি গুলো না আমার কাছে সত্যিই হাস্যকর মনে হয়েছিল। কি করবো বল? হাসি চাপতে পারি নি যে। তবে সেই হাসিই যে আমাদেরকে জিতিয়ে দেবে তা কি আগে থেকে জানতাম! আমার হাসি দেখে তোর বক্তৃতার মাঝখানে নির্বাক হয়ে যাবার ভঙ্গিটা আমার চাপা হাসিটাকে পরিণত করল অট্টহাসিতে। তবে সেদিন মাথা নিচু করে আমায় যে গালিটা দিয়েছিলি, তা আমার কানে এসেছিলো। আরো শুনতে পেয়েছিলাম তোর সামনে রাখা কাঠের টেবিলে তোর কলমের নিভ ভাঙ্গার সুক্ষ শব্দ।

তুই তখন ক্লাস সিক্সে উঠেছিস। আমি ক্লাস নাইনে। তুই তখন একটা এগারো বছরের ছেলে, আর আমি চৌদ্দ ছুঁই ছুঁই। মনে আছে তোকে একবার পিচ্চি বলে ডেকেছিলাম বলে দাঁত খিঁচুনি দিয়ে অসভ্যের মত কিসব বলতে বলতে চলে গেছিলি? আমার কিন্তু সব মনে আছে। মনে আছে আরো অনেক কিছুই। তার বেশ কয়েকদিন পর যখন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অনুশীলন চলছে, আমি সখের বসে বর্শা ছুড়েছিলাম। বর্শাটা বেশিদূর এগুলো না। হঠাৎ শুনতে পেলাম আকাশে বাতাসে কম্পন ধরানো এক কংসসুলভ অট্টহাসি। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম তুই। ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলাম সেদিন, জানিস? তবে বলতে আজ বাধা নেই, সেদিনই প্রথম কোন ছেলের হাসি এতটা নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। ছেলেরা হয়তবা মেকি হাসি হাসতে জানে না, অথবা তা ধরতে জানে না মেয়েরা। তবে সেদিন কেন জানি মনে হয়েছিল, এতোটা নির্মল না হলে কি কেউ এভাবে হাসতে পারে আদৌ? তবুও সেই নির্মলতার মাঝে কোথায় যেন একটা নির্মমতা ছিল, যার কারনে সেদিন কোন শব্দ না করেই চলে গিয়েছিলাম। জানিস, তার পর থেকে আমি আর বর্শা হাতে নেই নি।

সেদিন জানিস প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল তোর উপর যেদিন কিনা তুই নষ্ট করলি আমার সাধের সোলার স্টেডিয়ামটা । কতটা কষ্ট করে যে ওটা বানিয়েছিলাম আমি বিজ্ঞান মেলার জন্য!রাগে একটা থাপ্পড়ও মেরেছিলাম তোকে। তারপর থেকে তোর যে কি হল! আমার পিছু পিছু আমার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়া,আমার ক্লাসের সামনে দিয়ে অনর্থক যাতায়াত করা, আর গোলগোল দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে আমাকে খোঁজা- এগুলোর অর্থ কি বলতে পারিস?আচ্ছা ওটা কি তোর প্রেম ছিল নাকি নেহাতই ছেলেমানুষি?  তোরা প্রেমের ছলে ছেলেমানুষি করবার সুযোগ পাস। প্রেমে ব্যার্থ হবার পর দিনকয়েক গভীর শোক পালন করে নিজেকে বার বার বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকিস, ওটা তোর প্রেম ছিল না, ছিল পাগলামি, ছিল ছেলেমানুষি। কিন্তু আমাদের মেয়েমানুষি করবার আইন কেউ করে না কেন! আমদের প্রেমটা জানিস আগুনের মতন খানিকটা। বৃদ্ধ ভুলবশতই আগুনে পড়ুক, বা শিশু খেলাচ্ছলেই, দুজনকেই আগুন দগ্ধ করবে। ছেলেমানুষি মেয়েমানুষির কোন জায়গা নেই সেখানে।একবার কারো মহাকাব্যের নায়িকা হবার সাধ জাগলে আমরা যে জানি না কিভাবে পিছপা হতে হয়। আমি তো এটাও জানি না সে সময়টায় আমার ঠিক কি হয়েছিল।তবে এটুকু জানি যে ভাবনাগুলোতে তোকে একটু বেশিই সময় দিয়ে ফেলছিলাম।আর শেষে যা ঘটবার তাই ঘটলো, গ্রীক ইতিহাস উঠলো মাটির চুলোয়।একিলিস, হেক্টর,প্যারিস, হেলেন, দেবী আফ্রোদিতি হয়ে পড়ল একা।

আজ তুই ষোল, আমি উনিশ। আজ হঠাৎ করেই  তোর কথা কেন মনে পড়ল বুঝতে পারছি না। আমি এখন একটা পাবলিক ভার্সিটিতে আছি, প্রথম বর্ষে। জানিস, সেখানে একটা নতুন বন্ধু পেয়েছি। হঠাৎ একদিন মনে হল কাউকে বলি আমাদের এই অকথিত প্রেম কিংবা ছেলেমানুষি। ওকে আমি সবটুকু বলেছি, সব সব সব। একদিন কথায় কথায় বলেছিলাম ওকে,
                " যে প্রেমে বিরহের অস্তিত্ব নিশ্চিত, সে প্রেমই কেবল কাম্য"
সে কোন কথা বলল না, কেবল মৃদু হাসল। হঠাৎ করে তার মাথায় কি ভূত চাপল জানি, হঠাৎ করেই বলে ফেলল, সে নাকি কাগজে কলমে আটকে ফেলতে চায় আমাদেরকে। ভেবে দেখ, কতটা বোকা না হলে কেউ এমনটা বলতে পারে! কলম দিয়ে লেখা যায় গল্প, লেখা যায় উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ। কিন্তু জীবন? কিন্তু জীবন কি লেখা সম্ভব ওই কলমের কালিতে? অনুভুতি কি কখনো প্রকাশ পায় এ তুচ্ছ খেলায়?  আমি রাত দিন যতই রবি ঠাকুরের বাণী আওড়াই না কেন, আমি জানি রবীন্দ্রনাথ মিথ্যুক, তিনি ছলনাময়।তিনি এতোটা কাল মিথ্যে গল্প শুনিয়েই কাদিয়েছেন ওই মূর্খ সমাজকে। আসলে হৈমন্তী বলে আদৌ কেউ নেই, কেউ নেই অপু বলে।আমি জানি শরতের দেবদাস মৃত, পারু কাল্পনিক বৈ আর কিছু নয়। যতই আমি নজ্রুলের কবিতা ঝরাই দুঠোঁট দিয়ে, আমার জানা আছে নজরুল আর বেঁচে নেই। আর ওঁর কবিতা? সেগুলতো কেবল জড়বস্তু মাত্র। কিন্তু আমাদের আবেগগুলো কি দোষ করলো বল তো? ওরা কেনই বা সীমাবদ্ধ হতে যাবে ঐ দু'টাকার একটা চারকোণা কাগজে! ওরা তো আর রবিন্দ্র-শরত-নজরুলদের মতন ছলনাময়দের কাল্পনিকতার আশ্রয়ে সৃষ্ট নয়, তাই কি? তাহলে এরূপ দুঃসাহস করা মূর্খতা ছাড়া আর কি হতে পারে!

বেশি কিছু বলার ইচ্ছা ছিল না তোকে। তবুও কথার ট্রেন চলল অনেকটা পথ।মহাকাব্যের ব্যাপারটা কাল্পনিক ধরে নেওয়াটা তোর জন্য শ্রেয়। তবে সেটা যে সম্পূর্ণই কাল্পনিক তা কিন্তু নয়। চারটা মহাকাব্য তো শেষ। পঞ্চম মহাকাব্যের নায়িকা হবার খুব সাধ ছিল আমার। তবে যে মহাকাব্যের মহানায়িকা হবার সাধ জেগেছিল আমার চৌদ্দর সিঁড়িতে,আজ উনিশ নাম্বার সিঁড়িতে এসে সেই মহাকাব্যের পাতা একটা একটা করে ছিঁড়তে ছিঁড়তে শেষই করে ফেলেছি। এটাকে তুই মেয়েমানুষি ভেবে যদি সত্যিই শান্তি পাস, তবে তাই সই।





                                                                                                            ইতি,
                                                                                                                  তোর চৌদ্দ.....................

    

             (ধন্যবাদ বিশেষ বন্ধুটিকে যিনি আমাকে দুঃসাহস করার সাহসটা দিয়েছে। সত্যকে  নিয়ে মূর্খতা করবার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী)
                                 

                                                                                                                      



মন্তব্যসমূহ