মুগ্ধ আসবেই - রাজন
মুগ্ধ আজ খুবই অবাক হচ্ছে। তার ছাউনি থেকে ব্রিজের মোড় পর্যন্ত যতোগুলো আড্ডা ছিলো সব কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে। রমিজ মিয়ার চা স্টলে লোকসংখ্যা একজনও কমে নি বরঞ্চ আরো বেড়েছে। কিন্তু কারো মুখে কোন কথা নেই। সবাই কেমন নির্লিপ্ত। দেখে মনে হলো সবাই নিজের ভেতর ডুবে আছে। স্টলের পাশ দিয়ে হেঁটে আসতেও কেমন এক প্রশান্ত বাতাস এসে মুগ্ধকে সুবাসিত করে দিলো।
সামনে
আমতলায় এসে মুগ্ধ আরো তীব্রভাবে অবাক হলো। যে ছেলেগুলো আমতলা কলোনীর মানুষজনদের ঘুম
হারামের কল ছিল তারা আজ বড্ড শীতল। কেউ কোন কথা বলছে না। সকলে গোল হয়ে বসে আছে এক ধ্যানে।
মনে হচ্ছে প্রত্যেকের আত্মা যেন জোড়া লেগে একাকার হয়ে এক আত্মায় পরিনত হয়েছে। অথচ এই
ছেলেগুলো সবসময় মাতোয়ারা থাকতো কার গার্লফ্রেন্ডের ফিগার কেমন, কার মোটর বাইক কত দামী,
কার ফোন, ড্রেস কোন ব্র্যান্ডের, কে কতবার সেক্সুয়ালী মিট করতে পারে এবং আরো নানান
বিষয় নিয়ে তালগোল পাকিয়ে আমতলা বিনাশ করে রাখতো।
কি
হলো তাদের?
এটা ভেবে মুগ্ধ একটা বিড়ি ফুঁকতে যাবে বলে বিড়ি বের
করতে দেখে লাইটার নেই। বিড়ি হাতে নিয়ে ব্রিজের মোড়ের দিকে হাঁটছে।
দূর
থেকে দেখলো নন্দিতা ব্রিজের মাথায় দাঁড়িয়ে। দেখে মনে হচ্ছে মুগ্ধের জন্যই অপেক্ষা করছে।
মুগ্ধ কাছে গিয়ে নন্দিতাকে দেখে আড়ষ্ট হয়ে গেল যেন। এতো আবেদন নিয়ে নন্দিতা কখনো ব্রিজের
মোড়ে আসে নি। নন্দিতা বাসি ফুলের মতোও যদি ব্রিজের মোড়ে থাকতো তবু তাকে এলোমেলো ছিন্নভিন্ন
অবস্থায় দেখতো মুগ্ধ। কিন্তু আজ এতো আবেদন তবুও কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। ব্রিজের মোড়ে
যতগুলো হাত, চোখ শরীর নন্দিতাকে মুচড়ে দিতো তারা সকলে যেন কোমল পাথর? এই প্রথম নন্দিতা
ঈঙ্গিতপূর্ণ বাঁকা হাসি হাসেনি মুগ্ধকে দেখে। খুব নির্মল, পবিত্র এবং শাশ্বত হাসি হাসলো
এতো আবেদন নিয়েও।
মুগ্ধের দিকে লাইটার এগিয়ে দিয়ে নন্দিতা বলে - আপনার ভেতরের আগুন দিয়ে বিড়ি ধরাতে পারেন না?
প্রশ্নটা যেন শুনতেই পায় নি মুগ্ধ। বিড়ি ধরাতে ধরাতেই বললো - আপনার গন্ধ আজ সম্পূর্ণ আলাদা লাগছে।
নন্দিতা
মুচকি হেসে ব্রিজের রেলিং এ বসতে ইশারা করে বলে মুগ্ধকে। "আপনাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না।
যে লোকটার সাথে মাঝে মধ্যে বিড়ি ফুঁকতেন তিনি এসেও আপনাকে বহুবার খোঁজ করতো। হঠাৎ হঠাৎ
কি সব চিৎকার বলতো। কাল রাতে কি ভয়ংকরভাবে শকুনগুলো আমাকে নিংড়ে নিলো। ভেবেছিলাম এটাই
শেষ রাত। কিন্তু কে যেন বললো, মুগ্ধ আসবে। আর সন্ধ্যায় যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন থেকে কি
জানি এক সুবাতাস দেখলাম চারদিকে!"
মুগ্ধ
বিড়বিড় করে বলতে থাকে - মুগ্ধ আসবে, মুগ্ধ আসবে! হ্যাঁ! মুগ্ধ তো আসবেই। অস্ফুট স্বগোতক্তির অনুরণনে বাতাসে কাঁপন ধরায়। সেদিকে খেয়াল থাকে না মুগ্ধর...
বলতে
বলতেই মুগ্ধ হাঁটতে থাকে, ভাবতে থাকে - ও ঠিকই বলেছিলো একদিন মানুষ ঘরে ফিরবে। দেখতে চাইবে কোথায়
সে আর ঘরের মালিক। তখন মানুষ কোমল হবে, হবে আরোও গোপন। এমন শীতল হবে যে মানুষ নিজের
ঘরের বাইরে থেকে বের হবেনা। তাদের কথা হবে চোখে, আত্মায় আত্মায়। ঘুরে বেরাবে তার কুঠরি
থেকে কুঠরিতে, প্রতিটি আসবাব খুঁটিয়ে খুটিয়ে দেখবে। তার আঙ্গিনায় দৌড়াবে, রোদ পুহাবে, জোছনা
দেখবে, জোছনায় অবগাহন করবে। এভাবেই শ্যামল শীতলতায় ভরে উঠবে তার ঘর, সমাজ, সংসার এবং
অধিষ্ঠিত শাশ্বত সত্য। এটা কি ঐ কথারই প্রতিফলন?
'মুগ্ধ
আসবেই তবে-' বলে হাসতে হাসতে মুগ্ধ হাঁটছে.....

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন