নুসফা - শাইয়িন কবির

 ঠিক কোথায় বসে আছে সে এটা জানে না মুগ্ধ। বিমানবন্দরের গুদামের মতন বড় একটা হলঘর। তাতে সারি সারি টেবিল চেয়ার পেতে রেস্তোরা মতন কিছু করা হয়েছে। এক পাশের একটা সারির মাঝের দিকের একটা টেবিল দখল করে চেয়ারে পা ভাজ করে উঠিয়ে দিয়ে বসে আছে মুগ্ধ। ভিড়ভাট্টা কোনদিনই ভালো লাগে না মুগ্ধের। তবে আজ কেন জানি না ভালোই লাগছে। পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট খুঁজে হতাশ হয় সে। এইমাত্র শেষ সিগারেটটা শেষ হয়ে গেছে।


খালি প্যাকেটটা টেবিলের পাশে রাখা ময়লার ঝুড়িতে ফেলতে গিয়েই খেয়াল করলো পাশে কে একজন এসে দাঁড়িয়েছে। নারীমূর্তি। অবাক হয় না সে, তবুও একটা ভান ধরে তাকায় মেয়েটির দিকে।

 

নাহ! নন্দিতা নয়। এই প্রথম দেখছে মেয়েটাকে। বেশ সুশ্রী দেখতে সে। হাতে ধরা নতুন একটা এডভান্সড এর প্যাকেট মুগ্ধের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, “ওহ! শেষমেশ পেলাম আপনার দেখা। কত খুজেছি জানেন?”

“যেই জেনেছে রসপন্থি, সেই দেখিতে পায় অনায়েসে” একটা মুচকি হাসি দিয়ে বেশ একটা ভঙ্গি করে বলে মুগ্ধ।

হেসে ফেলে মেয়েটাও।

প্যাকেট খুলে একটা কড়কড়ে সিগারেট বের করে নেয় মুগ্ধ। কিছুক্ষনের জন্য বাসনায় ম ম করে উঠে বাতাসটা। একরাশ ধোয়া ছেঁড়ে মুগ্ধ বলে, তারপর?

“তারপর কিছু না। আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে।”

কোথায়?

সুবাতাসের প্রয়োজন যেখানে।

 

মুগ্ধের মনে পড়ে। নন্দিতা চলে যাওয়ার আগে বাতাসটা গুছিয়ে একটা ঝুলিতে বেঁধে দিয়েছিলো।

“সেটা তো নেই আমার কাছে এখন।”

“কি বলছেন? এই মহাবিশ্বে তো শুধু আপনার কাছেই সেটা থাকার কথা।”

“হ্যাঁ! মানে… বাসায় রেখে এসেছি।”

“চলুন! আপনার বাসায় যাবো”

কথাটা শেষ হতে না হতেই একটা হড়কা বানে একগাদা দুর্গন্ধযুক্ত পানি ঢুকে পড়ে সেখানে। কিছু বোঝার আগেই মুগ্ধের হাত ধরে টানতে টানতে সেখান থেকে বের করে আনে মেয়েটা।

 

বাইরে রোদ ঝলমল করছে। মুগ্ধের দিকে তাকিয়ে একবার হেসে নিলো মেয়েটি। বললো, “এই পথ কাটামুক্ত নয় মহাশয়। চলুন বাসার দিকে যাওয়া যাক” ।

 

বিকেল নেমে গেছে। অলিগলি-সুড়িপথ-ফ্লাইওভারের নিচে অন্ধকার নেমে আসে আন্ডারপাস ধরে অনেক দূর হেটে একটা হাইওয়েতে এসে পৌছিয়েছে তারা। মানুষে মানুষে পরিপূর্ণ তবুও কেমন শান্ত সবকিছু। রাস্তার দুপাশ দিয়ে গাছের সারি চলে গেছে সমান্তরাল ভাবে। গাছের সারির পেছনে কয়েকটা টং এর দোকান। সেখানে বহু প্রাচীন কয়েকজন বন্ধুকেও দেখতে পায় সে। তাদের উদ্দেশ্যে একবার হাসেও।


পকেট হাতড়ে আবার হতাশ হয় মুগ্ধ। দুপুরে খোলা কড়কড়ে এডভান্সড এর প্যাকেটটা বাসায় ফেলে এসেছে সে। মা ফিরলেই প্রথমে দেখতে পাবে জিনিসটা। কি আর করা!


সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। এবার থামে মেয়েটা। শুনশান ফাকা রাস্তা, দু একটা ট্রাক বাস হেডলাইটগুলো জ্বেলে সাঁই সাঁই করে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে তাদের। এখানে বাতাস ফুরফুরে। মেয়েটি এবার মুগ্ধের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, এখানেই আমরা সুবাতাস এর আবাদ করবো।

“আপনার নামটা জানা হলো না।”

“নুসফা”

 

আর দাঁড়ায় না মুগ্ধ। সামনে ফিরে ধীর পায়ে হাটতে থাকে সে। হাটতে হাটতেই এক হাত দিয়ে নন্দিতার বেঁধে দেয়া ঝুলির মুখ আলগা করে দেয়। এক অনির্বচনীয় সুবাসে ভরে ওঠে চারপাশ। মুগ্ধ এগিয়ে যায়। অনেক পথ পেছনে পরে থাকে। এগুতে এগুতে নিজের অজান্তেই একটু আগে শোনা নামটা মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে।

“নুসফা- সংজ্ঞায়িত”

 

চিরকাল অসংজ্ঞায়িতের পথে হাটা মুগ্ধকে কোন সংজ্ঞায়নের পথ দেখাচ্ছে সে?

কে জানে!

এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না মুগ্ধেরা!






মন্তব্যসমূহ