হাসির গালে দীর্ঘ দাগ - আহমেদ সোহাগ

লোকেমুখে একটা কথা প্রায়ই বলতে শোনা যায়, মাসের শেষদিকে সবার পকেটই নাকি টানটান থাকে। ব্যাপারটা বিত্তবানদের জন্য প্রযোজ্য কিনা তা না জানা থাকলেও মুগ্ধ মানে এই উক্তিটা মধ্যবিত্তদের জন্য সত্যতা রাখে।
ছুটির দিন সকাল সকাল মুগ্ধ পথে বেড়িয়ে পড়েছে,টিউশনি সময়মত ধরতে হবে বলে কথা। হাটতে হবে বেশ খানিকটা পথ! সত্তর মিনিট! যদি এই রুটটায় বাস চলতো তবে নাহয় স্টুডেন্ট ভাড়া হিসেবে সুপারভাইজার কে দশ টাকা ধরিয়ে দেয়া যেতো, তাতে দিনে টাকা বিশেক খরচা পড়তো! দিনে কুড়ি টাকা হলে সপ্তাহে চারদিনে মিলে আশি,মাসে তিনশত বিশ! এটুকু নাহয় খরচ করাই যেত।
এই পথটায় বাস চলেনা বলে হেটেই যেতে হচ্ছে। নয়তো রিকশাওয়ালার সাথে জোরাজুরির পর দিনে আসা যাওয়া সাকুল্যে ৭০+৭০ = ১৪০ টাকা দেবার সাধ্য কি আর আছে! তবে যে শলাকা খরচেই টান পড়ে যাবে!
আজ সকাল বেলা রৌদ্রের তেজটা বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছে মুগ্ধ। "আচ্ছা,প্রত্যেক শুক্রবার সকাল থেকেই আমার এতো রোদ্রের তেজ গায়ে লাগে কেন!",ভাবে মুগ্ধ। একটা ছাতার প্রয়োজনীয়তা বোধ হচ্ছে তার। রঙিন ছাতা! রঙিন ছাতা হলে শখটাও মিটতো। যাকগে,ছাতার জন্য পকেট অপ্রস্তুত। এদিকে শার্টের পেছনের দিকের রঙটাও জ্বলে গেছে।
রৌদ্রে জলা শার্ট দেখে তার স্টুডেন্ট গতকালও মিটমিট করে যে হাসছিল,তা চোখ এড়ায়নি মুগ্ধের। একটু অসংকোচতা কাজ করলেই বা কি করার!
এই যেমন সেদিন জুতোজোড়া রাস্তাতেই ছিঁড়ে গেল! হাতে করে নিয়েই ফিরতে হয়েছিল। লোকে কত ঠাট্টা ভঙ্গিতে চাইলো!
এবার সে নতুন জুতো কিনেছে। বেশ টেকসই জুতো-প্লাস্টিক টাইপ জুতো। দামেও সস্তা,টেকেও বেশিদিন। যদিও পায়ের আঙুলগুলোর চামড়া ছিলে জ্বালাপোড়া করে একটু-আধটু। দামের দিকে চেয়ে নাহয় এটুক মেনে নেয়াই যায়।
হাটতে হাটতে স্টুডেন্টদের বিল্ডিংয়ের নিচে এসে পৌছেছে মুগ্ধ। লিফটের ভেতরে প্রবেশ করেই গ্লাসে মুখয়বটা একবার দেখে নিল সে। তৎক্ষণাৎ  লিফটে তার সহযাত্রী এক সুন্দরীর আগমনেই ভদ্র হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে গেল মুগ্ধ। মেয়েটাকে দেখতে ফিল্মের হিরোইন টাইপ বললেও ভুল হবেনা। তিনি কানে হেডফোন লাগিয়ে কথা চালিয়েই যাচ্ছিলেন। ফোনের ওপাশে বান্ধবী হবে হয়তো। কথার ভাবভঙ্গী তাই-ই বলে। অনন্যাসুন্দরী এই মেয়েটাকে মুগ্ধ এই বিল্ডিংয়ে প্রতিনিয়ত আসার সুবাদেই চেনে;তিনিও চেনেন কিনা কে জানে! নামীদামী বিত্তবান মানুষরা অতিসাধারণদের চিনবেনা সেটিইতো স্বাভাবিক।
যতবারই দেখা হয় তখনি কানে হেডফোন গুঁজে থাকা,মাউথস্পীকার ঠোঁটের কাছে নিয়ে ফোনে কথা বলা...
তিনি এখন মুগ্ধের পায়ের বর্ণনা দিচ্ছেন,ওপাশের জনকে। মেয়েটির আড়চোখের কটু চাহনি আর হাসি-হাসি ভাব অন্তত তাই বলে। "মেয়েটা ফোনের ওপাড়ে থাকা বান্ধবীকে সাথে করে বোধহয় আমাকে নিয়েই হাসছে। যাক,বিত্তবানদের আড্ডার টপিকস তো হয়েছি!",ভাবতে ভাবতে মুচকি হেসে দিল মুগ্ধ। বাঁকা মুচকি হাসি যেন গালে দীর্ঘ দাগ এঁকে দিল। এসব কটু বিষয় আর গায়ে লাগায়না মুগ্ধ। অনুভূতিগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। সময়ের সাথে সাথে অনুভূতিগুলোও ভোঁতা হয়ে যায়। ইতস্তত বোধ করেই বা কি আসবে যাবে!
বাস্তবতা তাদেরকে এখনো পরিস্থিতির মুখোমুখি করেনি,তাই তারা হয়তো এখন অব্দি অবুঝ! বরং মুগ্ধ মুচকি হেসেই যায়!
আচ্ছা,কী কারণেই বা মুচকি হেসে দেয় মুগ্ধ? আচ্ছা! এই হাসিকেই কি উপহাসের হাসি বলা হয়?
মুগ্ধ এতো মানে খোঁজে না। এই সময়টুকু তার নেই।

মন্তব্যসমূহ