ভেরোনিকার কাছে চিঠি - এস এইচ মিশু
ভেরোনিকা,
চিঠির শুরুর সম্বোধন দেখে তুই অবাক হয়েছিস, আমি জানি। অবাক করে দেয়ার কাজটা তুইই সবথেকে ভাল করতি। আজ না হয় আমিই করলাম।
আমি কতো কিছুই না করতে পারতাম! কিছুই করা হয়ে ওঠেনি। অনেককিছু করার ক্ষমতা ছিলো আমার; কিন্তু যখন করলাম, আফসোস, তুই সেগুলোর কিছুই জানতে পারলিনা।
অথচ দেখ, তোরই জানার কথা ছিলো সব থেকে বেশি।
কথা তো অনেক কিছুরই থাকে। সব কথা রাখা যায়না, না রে?
এই যেমন ধর, এই চিঠিটা তোর নিজের পড়ার কথা ছিলো, কিন্তু আমার তোকে পড়ে শোনাতে হচ্ছে! প্রকৃতির খেয়াল বড় অদ্ভুত।
মনে আছে তোর, আমি বলেছিলাম আমি তোকে যেকোন মূল্যে ধরে রাখতে চাই?
তোর মনে আছে আমি তোকে বলেছিলাম,
আমি তোর সাথে থাকার জন্য সবকিছু করবো?
আমি জানি তোর মনে আছে। তোর সবকিছু মনে থাকে। তুই আমার সবকিছু জানিস।
আমার মনে হয়, প্রথমবার তোর হাত ধরার সময় আমার হৃৎপিণ্ড সেকেন্ডে কতোবার উঠবস করেছে, তাও তুই জানিস।
তুই তো আমার সব বুঝিস, সেদিন কিভাবে বুঝলিনা যে আমি আসবো?
তুই কেন বুঝলিনা আমি তোর পেছনে দাঁড়িয়ে? তুই কেন ফিরলিনা আমার দিকে?
বড় অদ্ভুত লাগে। তুই তখন কী ভাবছিলি? আমি যখন আসবো, আমাকে অবশ্যই বলবি।
জানিস, তোর আব্বু প্রথমে বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন। পরে যখন একটু ধাতস্থ হলেন,
কোত্থেকে একটা ৬০ গ্রেডের রড এনে আমাকে সামনে পেয়ে সাঁই সাঁই করে আমাকে পেটাতে লাগলেন। আমি অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম। রডের ব্যবসা করলেই কি বাসায় রড রাখতে হবে?
মাথা ফেটে গিয়েছিল আমার।
একটা মাত্র সাদা শার্ট আমার, তাও রক্তে মাখামাখি। সে দাগ কয়েকবার ধোয়ার পরেও ওঠেনি।
আমি অবশ্য তোর আব্বুকে বলে এসেছি যে আমি এতে কিছু মনে করিনি। আবেগের বশে মানুষ না বুঝেই অনেককিছু করে, আমি জানি।
আমি কি করতাম বল? তুই হুট করে আবার প্রেমে পড়ে গেলি। ছেলেটাকে বিশাল আয়োজন করে প্রোপজও করে ফেললি।
আর ছেলেটা নির্লজ্জ্বের মতো তা অ্যাকসেপ্টও করে ফেললো! আমি তোকে কিছু বলিনি তখন। আমার মনে হয়েছিল এতে তোর ভাল হবেনা, তাও বলিনি কারণ তুই আমার কোন কথাই শুনতিনা।
আমি শুধু দেখতে লাগলাম কিভাবে তুই আমার থেকে দূরে সরে যেতে লাগলি, আর আমার পায়ের নিচের মাটি ধসে যেতে লাগলো, আমি নিঃসীম গহ্বরে পড়ে যেতে থাকলাম।
আমি আস্তে আস্তে জড়বস্তুতে পরিনত হতে লাগলাম, জানিস?
আমি খেতে পারতাম না, ঘুমাতে পারতাম না, হাঁটতে- চলতে পারতাম না, কথা বলতে পারতাম না,
পড়তে পারতাম না, লিখতে পারতাম না, কারো কথা আমি শুনতেও পারতাম না।
কি প্রচণ্ডভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম তোর ওপর, সেটা তুই কিভাবে বুঝলিনা? নাকি আমিই তোকে বুঝতে দেইনি? জানিনা।
অবস্থার ক্রমাবনতি দেখে আমাকে খুলনা পাঠিয়ে দেয়া হলো। তুই শেষ দিনটাতেও সময় বের করতে পারলিনা। কয়েকদিন রেখে আব্বু আমাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেল।
আচ্ছা বল, আমি কি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম?
কষ্ট পাচ্ছিলাম সেটা সত্যি, কিন্তু পাগল তো হইনি। এত মেজাজটা খারাপ হলো!
আমি কিছুই বলিনি। আমাকে টেনেও মুখ খোলাতে পারেনি।
কারো সামনেই মুখ খুলতাম না।
কী করতাম বল? আমার শুধু তোর সাথেই কথা বলতে ইচ্ছা করতো!
ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আমি শুধু তোর সাথেই কথা বলে গেছি, তোর কথাই শুধু শুনে গেছি। তুই এমনভাবে চলে যাবি তা কি জানতাম বল? কষ্ট হবে না?
আমি তোকে কতটা ভালোবাসতাম জানিনা, তবে প্রতিনিয়ত তোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতাম।
সে অনুভূতি বড় ভয়ংকর, বিশ্বাস কর, ভেতরটা ভেঙে চুরে ফেলতো।
আর তুই যাওয়ার পর তোর অভাব অনুভব করি। এ অভাববোধ মাঝে মাঝে নিঃশ্বাস নেবার বাতাসটুকুও কেড়ে নেয়। আমি কি করতাম বল?
সারাজীবন বলে আসলি বিয়ে করবিনা। হুট করে বিয়েটাও কেন ঠিক করে ফেললি তার সাথে? তুই এরকম বোকার মতো কাজটা কিভাবে করলি?
দাওয়াত কার্ডটার ডিজাইন কে করেছিল?একটুও ভাল হয়নি।
যখন বুঝতে পারলাম, আমার বাকি জীবন তোকে ছাড়াই থাকতে হবে, মাঝে মাঝে মনে হতো মরে যাই।
কিন্তু তাও পারতাম না। মৃত্যুর পর যদি সত্যিই কোন জগত থাকে,
সেখানেও আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারতাম না বিশ্বাস কর।
তোর হাত ধরে এতদিন হেঁটেছি,
বেঁচেছি, সারাজীবন তোর সাথে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছি।
আমি মরে গেলে আমার অল্প অল্প করে জমানো এতোদিনের স্বপ্নগুলোর কি হতো বল?
তোর মৃতদেহের পাশে আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে তোর মা যা বোঝার বুঝে নিয়েছিলো।
পুলিশ এসে যখন আমাকে ধরে নিয়ে গেল, আমি তখন তোর মা কে কাঁদতে দেখে আমার একটুও কষ্ট লাগেনি, বিশ্বাস কর। কারণ আমি জানি, বেঁচে থাকার অবলম্বনটা হুট করে হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট কেমন, তিল তিল জমানো স্বপ্নগুলো মুহূর্তেই চোখের সামনে লীন হয়ে যেতে দেখার কষ্ট কেমন। আমি জানি।
আমি আর কি করতাম বল?
তোর আব্বু মার্ডার কেইস করেছে। শালার দুনিয়ায় কোন বিচার নাই।
তোর আব্বু আমার বিরুদ্ধে কেইস করতে পারলো, আমি তোর বিরুদ্ধে পারলাম না। কেন পারলাম না?
তুই যে খুন করলি, তার বিচার হবেনা? তাহলে এই দুনিয়ায় থেকে লাভ কী বল?
ভেরোনিকা, আমার যে অবস্থা দাঁড়িয়েছিল, আমি হয়তো এমনিতেই মরে যেতাম। মৃত্যুই সব কিছুর শেষ বলেই বিশ্বাস করেছি সারাজীন।
কিন্তু,
যদি তারপরেও একটা জগত থাকে?
সেখানে আমি তোকে ছাড়া কিভাবে থাকতাম? ভয় লাগতো খুব।
তুই মাঝে মাঝে ফোন বন্ধ করে রাখলেই আমি থাকতে পারতামনা। আর পুরো একটা জীবন?
আমি তোর সাথে থাকার জন্য সব কিছুই করতে পারতাম। কখনো বিশ্বাস করলিনা কথাটা। বোকা কেন ছিলিরে তুই এত?
সমস্যা নাই। তোর সব অপরাধ মাফ। একদম সব।
তুই অনেকবার আমার জন্য অপেক্ষা করেছিস। আরো কিছুক্ষণ না হয় কর।
আসছি আমি। প্লিজ আর ৫টা মিনিট বস!
__
"তোরই"
পুনশ্চঃ সিগারেট নিয়ে আসবো,
না এসে কিনবো?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন