ওয়ান সিক্সটি ফোর




বাঁকাচাঁদবাবু কমলাকান্তের জোবানবন্দী যে কেন লিখেছিলেন আজ তা হাড়ে হাড়ে টের পেলুম। সারাদিন ময়মনসিংহ জেলা কোর্ট এ ছিলেম। বলার অপেক্ষা রাখে না যে নোংরা আর নোংরামোর বিশাল এক আস্তানা এই কাঁচারি প্রাঙ্গন। বিচিত্র সব কাজকর্ম চলে এখানে... কি আর বলবো...
উকিল আগে থেকেই ঠিক ছিল,তবুও পৌছে তার জন্য আধ ঘন্টার বেশি অপেক্ষা করা লাগলো..
উকিলমশাই এলেন ভুঁড়ি দোলাতে দোলাতে,ত্রিশ বত্রিশ বছর বয়স হবে,বিড়ি খেয়ে খেয়ে ঠোঁট কুঁচকুঁচে কালো করে ফেলেছেন এরই মধ্যে। চেহারার মধ্যেই কেমন চোর চোর ভাব আছে,উকিলসুলভ ধূর্তামি শয়তানীকে ধারন করে ভাল মানুষ সেজে থাকা যে বেশ কঠিন অভিনয়ই তা বোধ করি এই ভদ্রলোককে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না... ফাইলটা ধপ করে টেবলে রেখে বললেন,বিদঘুটে একটা কেস নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম তো,বউ তার জামাইকে পিটায়ে মেরে ফেলছে... বুঝছেন,উকালতি পেশাটাই হচ্ছে দুনিয়ার সবচে খারাপ পেশা,মিথ্যা কথার আঁখড়া! মাঝে মধ্যে মন চায়....
এইটুকু বলে থেমে গিয়ে ছোট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি,দেন এবার আপনাদের কাজটা ধরি,খরচাপাতি দেন, আশা করি আজই শেষ হয়ে যাবে...
-কত লাগবে?
- দ্যাও হাজার পাঁচেক... ট্যাকা পয়সা তো লাগবেই
- কিন্তু আমি তো জানতাম শ পাচেক হলেই চলবে...
উকিলমশাই জিভ কামড়ে ধরলেন,হায় হায়! এইটা চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর কাজ, কি বলো কম করে তিন তো লাগবেই....
একটু হেসে তার হাতে পাঁচশো টাকার চারটে নোট দিয়ে বললাম,উকিলের প্যাচ মাইরেন না,চা পানি খাওয়ার জন্য দিলাম,কাজটা করে দেন তো...

এরপর আর কি....
 এ অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকো,ওই দপ্তরের কেরাণীর কাছে তোষামোদ করো,এইটার ফটোকপি দাও তো ওইটার মেইন কপি! এ মেঘশীতের দিনেও কালঘাম ছুটে যাওয়ার উপক্রম....তার উপর কোর্টের ফকিরগুলার উপদ্রব! পুরা বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার স্যাপার!

চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর দরবারে তার পিএ এর কাছে কাগজপত্র জমা দিয়ে বাইরে দাড়িয়ে আছি এমনসময় একজন যুবতী সামনে দিয়ে হেটে গেলেন,চেহারা খুব একটা জুতসই নয়,তবে শরীরের গড়ন মাশাআল্লাহ!
উকিলমশাই বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বললেন,ভালই সুন্দরী না মেয়েটা?
- তা বটে...
- কি মনে হয় বিয়ে হয়েছে?
- কে জানে?
- একজন বলেছিল পাত্রী দেখতে,যাই একটু দেখি কথা বলে....তুমি দাঁড়াও...

মনে মনে একচোট হেসে নিলাম,মানুষ পারেও বটে...
ফোন দুটোর তেল শেষ হয়ে পকেটে পড়ে আছে,একপ্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নির্বাসন বলা যায় আর এদিকে আড়াইটায় আসতে বলে সাড়ে তিনটেয়ও কোন খোঁজ নেই পিএ সাহেবের,ভোগান্তিই বটে....

বেশ কিছুক্ষণ পরে উকিলমশাই এলেন,চোখ টিপে বললাম,পাত্রী কেমন? চলবে?
- আরে ধুর! পুলিশ কনস্টবল!
হেসে বললুম,কেন? ভালোই তো,চাকুরীজীবী বউ... বউ ও হইল,আবার....
- চাকুরীটাই তো সমেস্যা রে ভাই,এঁদের ডিউটি করা লাগে,পাশাপাশি ওভারটাইমও,, বড় অফিসার বলবে গোসল করে পাক পবিত্র হয়ে এসো... আর কি... কোর্টেই আসুক না কয় মাস,এডভোকেট রাই....
- হতেই পারে...
- হতে পারে নারে ভাই,এমনটাই হয়...
- তা হয় হৌক, উনি এখানে কি করছেন?
- 164 ইয়ংম্যান! রেইপ কেস! ভিকটিম নিয়ে এসেছেন,ছয় বছরের বাচ্চা,গেটের সামনে বসে বসে যে বাচ্চাটা খেলতেছিল,নীল জামা পড়া,দেখেছ?

কথাগুলো বেশ সহজভাবেই বললেন,যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারই এটা...
তবে আমি চমকে না উঠে পারলাম না,ছয় বছরের বাচ্চা মেয়ে,সে কি বোঝে? লেডি কনস্টেবল এর আবেদনময়ী দেহের বাঁকগুলো দেখে উঁকিলমশায়ের মনে যে কামভাব জাগ্রত হয়েছিল তার মর্ম আমি বুঝি,কেননা জীবসত্তাকে অস্বীকার করার সাধ্যি কোন জীবেরই নেই... কাম জীবসত্তারই একটা অংশ মাত্র। তবে ছয় বছরের একটা শিশুকে দেখে.....চিন্তা করতেই শিউরে উঠছি! কতটা বিকৃত মানসিকতা হলে এমনটা সম্ভব!

সবচে ভয়াবহ যে কথাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, ধর্ষণ একটা মহামারীতে রুপান্তরিত হচ্ছে দিনদিন, তনুর ঘটনাটার কিন্তু  এক সপ্তাহও গড়ায় নি,আজই এ ধরনের একটা ঘটনা আমায় দেখতে হবে আমি ভাবি নি অথবা ভাবতেও পারি নি...
আজ একজনের ঘরে ঘটেছে,কাল আমি আপনি যে এর কবলে পড়বেন না তার গ্যারান্টি কই?...
আমরা আর তনুর গল্প দেখতে চাই না, কাউকে একশো চৌষট্টি ধারার মামলা নিয়েও আদালতের দুয়ারে দৌড়ুতে দেখার মত দুঃস্বপ্নেরও ইতি দেখতে চাই....
এ মহামারী আপনার জন্য অশনী সংকেত,আমার জন্য,সমাজের জন্য,দেশের জন্য.... আমরা কি পারি না,এ জঘন্য অপরাধটিকে চিরতরে নির্মূল করতে? অবশ্যই পারি,, শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছে,আর নিজ নিজ জায়গা থেকে একটুখানি এগিয়ে আসার প্রয়াস!

নৈতিক বা সামাজিক দায়িত্ববোধ!
যাই হৌক, আপনি তো এক পা এগুতেই পারেন, না?
আপনার একটা কদমই হয়ত হাজারটা ওয়ান সিক্সটি ফোর কে রুখে দিতে পারে......

21 March,2016

মন্তব্যসমূহ