একটি শয়তান ও কিছু ধোঁয়ার গল্প - শাইয়িন কবির

হাত থেকে টুং করে পাঁচ টাকার কয়েনটা রাস্তায় পড়ে যায়।
কালো পিচের রাস্তা!
আবছা আলোয় নিজের অক্ষমতা টের পায় মুগ্ধ, আপন মনে একবার হাসেও.....

ইদানীং আর মানিব্যাগ নিয়ে বের হয়না মুগ্ধ, টাকা না থাকলে মানিব্যাগ এর মুল্য কই?
জংশনের দোকানটা সে থেকে দুটো ডার্বি চায়, দোকানদার বেঁকে বসে, ছয় টাকার নিচে দেবেই না...
মুগ্ধের মেজাজটা খিঁচড়ে যায় আবার, বলে কিনা আগেও দুই টাকা পাওনা!

পুরোনো একটা অয়েল ট্যাংকারের উপরে চড়ে বসে মুগ্ধ, বেশ আয়েশ করে সিগারেট টা ধরায়....
কোন স্বাদই নেই, মনে হয় কাগজ পুড়িয়ে ধোঁয়া টানা হচ্ছে।
তবুও তিনটা টাকার সম্বল।

আকাশে চাঁদ উঠেছে!
বেশ বড় চাঁদ, জোসনায় টলমল খাচ্ছে পুরো আকাশ, যেন টুপটুপ করে গলে ঝড়ে পড়বে এক্ষুনি....
পরিবেশটা আরামদায়ক সৌন্দর্যের বটে, কিন্তু তামাকের এই বিস্বাদ তার তিরিক্ষি মেজাজটা আরো কয়েক ডিগ্রী বাড়িয়ে দেয়।
"ধুশশালা! "
বলে বিরক্তি ভরে সিগ্রেটটা ছুড়ে ফেলে দেয় মুগ্ধ।

নিচ থেকে একটা চাপা আর্তস্বর শুনতে পায়,
"উফপপ!  দেখে শুনে ফেলতে পারেন না মশাই?"
কোন কথা বললো না মুগ্ধ।
সিড়ি বেয়ে লোকটা ট্যাংকারের উপরে উঠে আসে।
"মুগ্ধ সাহেব! আছেন কেমন?"
"কে?" হতচকিয়ে বলে মুগ্ধ।
"ইয়ে মানে..... হাড্ডী ভাই আপনার কথা বলেছিল...."
"মি. লুসিফার?"

মুচকি হাসলেন মি. লুসিফার। পকেট থেকে একটা বেনসনের প্যাকেট বের করে একটা সিগ্রেট হাতে নিয়ে বললেন, আগুন হবে?
মুগ্ধ কিছু না বলে লাইটারটা এগিয়ে দিলো...
কেমন লোকটা! একটা সিগারেট অফার তো করতে পারতো.....
এমন ভাবছে মুগ্ধ তখন মুখ খুললেন মি. লুসিফার, "অনেকদিন সিগ্রেট শেয়ার করে খাই না, জানেন? আসলে তেমন কাউকে পাই না তো, তাই ভাবলাম... কিছু মনে করলেন না তো?"
ছোট্ট করে মাথা নেড়ে মুগ্ধ বললো, নাহ!
মুগ্ধের সামনের রডের উপর ঠেস দিয়ে বসে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেন,
"মন মেজাজ কি বেশি খারাপ?"
"না তো..."
"আরে মিঞা! বলে ফেলুন, হালকা লাগবে, যদিও জানি না এমনটা নয়, তবুও মুখে বললে একটা মানসিক শান্তি... হা হা হা! বোঝেনই...."
"বাব্বাহ! আপনি আবার সাইকোলজিস্ট হলেন কবে থেকে? "
"কি যে বলেন না? মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যাওয়ার সুমহান দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছিলো যে, সাইকোলজি না জানলে কিভাবে চলে?"
মুগ্ধ এবার না হেসে থাকতে পারলো না,
আজ তার তিনমাস ধরে পড়া ট্রাউজার্স টা ধুয়ে দিয়েছে মা, পকেটে লাইটার পেয়ে সে কি তুলকালাম কান্ড! সেই থেকেই মেজাজটা....

"শোনেন!" বললেন মি. লুসিফার, " আমিও এমন ঝক্কিঝামেলা কত পোহিয়েছি, আর বলবেন না নতুন নতুন যখন সিগ্রেট ধরলাম, একদিন রাতে বালিশের তলে লাইটারটা ভুলে রেখে দিয়েছিলাম, সকালে বিছানা গুছাতে এসে মা দেখে ফেলেছে, রক্ত চোখে জিজ্ঞেস করলো, কিরে! লাইটার কেন? আমি তো কি বলতে কি বলি, বললাম, আম্মা রাতে ভয় পাই... তাতে আরো গেল ক্ষেপে, বলে, শয়তানের বাচ্চা! আমারে শিখাস?
বেচারা বাপটা আমার উপাধি পেয়ে গেল। কেমন লাগে বলেন? হা হা হা"
মুগ্ধও হাসতে লাগে,
লুসিফার এর হাত থেকে আধ খাওয়া সিগারেটের জ্বলন্ত  টুকরাটা নিয়ে চোখ বুজে বড় করে টান দেয় মুগ্ধ। আহ.... 

"আরো বলি শোনেন, আমি তখন খাই গোল্ডলীফ, আর বাপ খায় বেনসন। তো আমার আবার সকালে উঠেই একটা লাগে, বোঝেনই... হজমগত একটা বিষয় আছে না? যাই হৌক, রাতে সিগারেট কিনে বাপের প্যান্টের পকেটে রেখে দিয়ে আসি, আমার পকেটে থাকলে প্রবলেম আছে,সকালে বাপ অফিস যাওয়ার আগে আবার তা যথাস্থান এ চলে আসে, একদিন ঘুম থেকে দেখি, টেবিলের উপর দুইটা সিগারেট আর একটা লাইটার, উঠেই ভাবলাম, একটা মেরে দিবো কিনা... পরে দেখি, এইটা তো আমার ব্রান্ড এরই।
বাপ পাশের ঘর থেকে উঁকি মেরে বলে,জ্বী! ওইটা আপনারই... বদ দেখছি, শালার এমন বদ দেখি নাই, শেষে কিনা আমার পকেটেই.... হা হা হা!"
হাসির শব্দে দুরের গাছে বসা রাতজাগা পাখি উড়ে যায়, এদিকটায় নাইট গার্ডের আনাগোনা কম, নয়ত ব্যাপারটা অন্য রকম ঘটতে পারতো।
মি. লুসিফার এর কাছ থেকে আরেকটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে জ্বাললো মুগ্ধ।
এখন বেশ হালকা লাগছে তার।

"আরেকদিন কি হইছে জানেন? বাপ সিগারেট ধরিয়ে আমার রুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেভ করছে, জ্বলন্ত সিগারেট টা টেবিলের উপর রাখা, ধোঁয়া নাকে যেতেই ঘুম ভাঙ্গলো, লোভ সম্বরন করতে না পেরে টেনেই বসলাম। দুই টানেই আগুন সিগারেটের গোড়ায়। বাপ পেছন ফিরে দেখে এই অবস্থা। এদিকে আমি তো ঘুমের ভান করে পড়ে রইছি...
কান টা ধরে টেনে উঠালো আমারে...
আমার চিল্লানিতে মা রান্নাঘর থেকে ছুটে আসলো, বাপ বলে, দেখো তোমার সুপুত্র করছে টা কি!
মা অবাক হয়ে বলে, কি করছে? ও তো ঘুমাই ছিলো।
বাপ রেগে বলে, ঘুমাই ছিলো! তবে আমার বেনসনটা কি ভূতে টেনে গেল?"
বলেই আবার হাসতে থাকে মি. লুসিফার..

আকাশের চাঁদটা হেলে পড়েছে,
হেমন্তের আভাস স্বরুপ মাঝরাতের পর শিশির জমতে শুরু করেছে পায়ের নিচে,হালকা করে কুয়াশাও....
দুরে নাইটগার্ডের হুইসেল শোনা যায়...
বেশ আগ্রহ নিয়েই শুনছিল, তিরিক্ষি ভাবটা কমে গিয়ে এখন পরিবেশটার সাথে মিশে গেছে মুগ্ধ, আর তার সাথে চারপাশটা যেন অদ্ভুত এক হাস্যরসে টইটুম্বুর হয়ে গেছে...
মুগ্ধও হাসতে লাগে, বিশুদ্ধ মুগ্ধতার হাসি।
এমন হাসি সে কতদিন হাসে নি....

"আচ্ছা মি.লুসিফার! আপনি এমন জোকার হলেন কবে থেকে বলেন তো?"
"মানুষের রুুপের সাথে সাথে আমারও চরিত্র বদলাতে হয়, নইলে আপনার ভেতরে ঢুকবো কিভাবে,বলেন? 
শুভাগত দা, মিশু সাহেব, আপনি....
চরিত্র বদলায়, আর সাথে সাথে আমিও...
 কেবল বদলাতে পারলাম না অভিশাপটাকে....."

গলাটা ধরে এসেছে লুসিফার এর....
পেছন ফিরে হয়ত অশ্রুমোচন এর বৃথা চেষ্টা করে একবার,
কে জানে?

পকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে আবার মুগ্ধের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, লাইটারটা প্লিজ.....
[আহমেদ সোহাগ ভাইয়ের #মুগ্ধ আর শুভাগত দা'র #মি_লুসিফার যুগলবন্দী]

মন্তব্যসমূহ